Monday, December 4, 2017

কবিতা

বুকের ভিতর খচ খচ করে উঠে বেদনারা ।
তুমি প্রিয়তমা; আত্মতুষ্টিতে ভাসো ।
তোমার চোখে রদেলা দিন ।
আমি উপকূলে সূর্য ডোবা দেখি ।
উর্বশীর চুলে রাত্রি নামলে ভয়াবহ একাকীত্ব বোধ করি ।
ঠিক পরদিন; তোমার চোখে সাজিয়ে নিই নিজেকে ।

পুড়ে যাবার অপেক্ষায় পথ হাটি আবারও ।

Saturday, December 2, 2017

কবিতা

ভেবেছিলাম পাথর হয়ে গেছি
আমি আর কোনোদিন কাঁদবনা  ।
কিন্তু আজ এ কি যন্ত্রণা !
খা-খা জোস্নায় ভেসে যাচ্ছে অভিমানী মেঘেদের দল,
আর আমার চোখে জল ।
আমি কাঁদছি............

Friday, December 1, 2017

কবিতা

তুমি আমি ।
আমাদের আকাংখা আকণ্ঠপ্রায় ।
তুমি আমি ।
আমরা হারিয়ে যাচ্ছি ; মিলিয়ে যাচ্ছি বিভোর স্বপনে ।

Wednesday, November 29, 2017

কবিতা

হ্যাঁ ওটা মৃত্যুই ছিল ।
আমি নেশায় মগ্ন ছিলাম ,
আর রাস্তার লাইট গুলো চমকাচ্ছিল ভূতরে নগরীর মতো ।
গাড়ি গুলো ছুটছিল বজ্র গতিতে , ওদের চোখে আগুন ছিল ।
পা বাড়াতেই প্রচণ্ড ধাক্কা !
আমাকে দুমড়ে মুচড়ে টেনে হিঁচড়ে
ফেলে দিল শীতলতম গহ্বরে ।
সময়ের জালে টান পড়ল ,
পট পট করে ছিরে গেল একেকটি সুতো ।

Tuesday, November 28, 2017

রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১)। বাংলাদেশের কবিতায় এক অবিসস্মরণীয় নাম। মাটি ও মানুষের প্রতি আমূল দায়বদ্ধ এই কবির শিল্পমগ্ন উচ্চারণ তাকে দিয়েছে সত্তরের অন্যতম কবি-স্বীকৃতি।
অকাল প্রয়াত এই কবি তার কাব্যযাত্রায় যুগপৎ ধারণ করেছেন দ্রোহ ও প্রেম, স্বপ্ন ও সংগ্রামের শিল্পভাষ্য। সাহস ও স্বপ্নে, শিল্প ও সংগ্রামে আপদমস্তক সমর্পিত এই কবি তার স্বল্পায়ু জীবনকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তারুণ্যের দীপ্র সড়কে। নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন আপামর নির্যাতিত মানুষের আত্মার সঙ্গে; হয়ে উঠেছিলেন তাদেরই কন্ঠস্বর।
কবি রুদ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্সসহ এমএ পাশ করেন। ছাত্র থাকা অবস্থায় সক্রিয়ভাবে ছাত্র ইউনিয়ন সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে বাউন্ডুলে এ কবির বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা গুণে শেষ করা যাবে না। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন রুদ্র। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশে সবগুলো আন্দোলনে কবি রুদ্রর সশরীর অংশগ্রহণ ছিল এবং হয়তো এসব থেকেই তিনি বেশ কিছু দ্রোহের কাব্য রচনা করেন।
আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব
লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা,
প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানা রঙ পতাকা ওড়ায়।
কথা ছিলো, ‘আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন,
আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ।
অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু
অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে।
জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি,
আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন”
পারিবারিক স্বচ্ছলতা থাকা স্বত্ত্বেও সেই পথ বেছে না নিয়ে বরং নিজের কয়েকটা রিক্সা ছিল, তা থেকে যা আয় হতো, তাতেই বেশ চলতেন। এছাড়া ঠিকাদারী ও চিংড়ির খামার করেছেন আর দুহাতে টাকা উড়িয়েছেন।পাঞ্জাবী আর জিন্সের যুগলবন্দী পোষাক তার নিজস্ব স্টাইল ছিলো। পরে জেমস এটা জনপ্রিয় করেন। রুদ্রর মদ্যপ্রীতি ছিলো বলিহারী! হুইস্কির তিনি বাংলা নামকরণ করেছিলেন ‘সোনালী শিশির’।তার জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে অন্যতম "যে মাঠ থেকে এসেছিল স্বাধীনতার ডাক, সে মাঠে আজ বসে নেশার হাট", "বাতাসে লাশের গন্ধ"। এই কবির স্মরণে বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার মংলার মিঠেখালিতে গড়ে উঠেছে "রুদ্র স্মৃতি সংসদ"। বিখ্যাত এবং বিতর্কিত বাংলাদেশী নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে তিনি ১৯৮১ সালে বিয়ে করেন এবং ১৯৮৬ সালে তাঁদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে।
ব্যক্তিজীবনে চরম মাত্রায় খামখেয়ালী ও স্বেচ্ছাচারী ছিলেন এ কবি। তার বাবাকে লেখা একটি চিঠিতে তার ব্যক্তিত্ব বেশ সুস্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছিলো। বিয়ের পরপরই তিনি তার বাবাকে এই চিঠিটি লিখেন।

আব্বা,

পথে কোনো অসুবিধা হয়নি। নাসরিনকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গত পরশু ঢাকায় ফিরেছি। আপনাদের মতামত এবং কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আমি বিয়ে করে বৌ বাড়ি নিয়ে যাওয়াতে আপনারা কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু আমি তো আমার জীবন এভাবেই ভেবেছি। আপনার সাথে আমার যে ভুল বোঝাবুঝিগুলো তা কখনই চ্যালেঞ্জ বা পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব নয়,স্পষ্টতই তা দুটো বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। ব্যক্তি আপনাকে আমি কখনোই ভুল বুঝিনি,আমি জানি না আমাকে আপনারা কিভাবে বোঝেন। এ তো চরম সত্য যে, একটি জেনারেশনের সাথে পরবর্তী জেনারেশনের অমিল এবং দ্বন্দ্ব থাকবেই। যেমন আপনার সাথে আপনার আব্বার অমিল ছিলো, আপনার সাথে আমার এবং পরবর্তীতে আমার সাথে আমার সন্তানদের। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাত কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়। আমরা শুধু এই সংঘাতকে যুক্তিসঙ্গত করতে পারি; পারি কিছুটা মসৃণ করতে। সংঘাত রোধ করতে পারি না। পারলে ভালো হতো কিনা জানি না। তবে মানুষের জীবনের বিকাশ থেমে যেতো পৃথিবীতে।

আমার মনে পড়ে না। এই ছাব্বিশ বছরে একদিনও পিতা হিসাবে আপনার সন্তানদের আদর করে কাছে টেনে নেননি। আশেপাশে অন্য বাবাদের তাদের সন্তানদের জন্য আদর দেখে নিজেকে ভাগ্যহীন মনে হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কখনো কষ্ট প্রকাশ করিনি। ছেলেবেলায় আমার খেলতে ভালো লাগতো। খেললে আমি ভালো খেলোয়াড় হতাম। আপনি খেলতে দিতেন না। ভাবতাম, না খেললেই বোধ হয় ভালো। ভালো মানুষেরা বোধ হয় খেলে না। আবার প্রশ্ন জাগতো, তাহলে আমার খেলতে ভালো লাগে কেনো? আমি কি তবে খারাপ মানুষ? আজ বুঝি, খেলা না খেলার মধ্যে মানুষের ভালো-মন্দ নিহিত নয়। কষ্ট লাগে। আমিও স্বপ্ন দেখতাম, আমি ডাক্তার হবো। আপনার চেয়ে বড় ডাক্তার হয়ে আপনাকে ও নিজেকে গৌরব দেবো। সন্তান বড় হলে পিতারই তো সুখ। আমি সেভাবে তৈরীও হচ্ছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কি যে এক বিরাট পরিবর্তন এলো ! একটি দেশ, একটি নতুন দেশের জন্ম হলো, নতুন চিন্তার সব হতে লাগলো। নতুন স্বপ্ন এলো মানুষের মনে। সবাই অন্যরকম ভাবতে শুরু করলো। আমিও আমার আগের স্বপ্নকে ধরে রাখতে পারিনি। তার চেয়ে বড় এক স্বপ্ন, তার চেয়ে তাজা এক স্বপ্ন, তার চেয়ে বেগবান এক স্বপ্নকে আমি কাছে টেনে নিলাম। আমি সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করলাম। আগেও একটু আধটু লিখতাম, এবার পুরোপুরি। আমি আমার আগের সব চিন্তা-ভাবনার প্রভাব ঝেড়ে ফেলতে লাগলাম। চিন্তা থেকে, জীবন থেকে, বিশ্বাস-আদর্শ থেকে, অনেক কিছুর সঙ্গেই সংঘর্ষ হতে লাগলো। অনেক কিছুর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির শুরু হলো। কখনো ক্ষোভে আমি অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলতে লাগলাম। আপনার সাথে আমার সাথে বিশ্বাসের সাথে মিল এমন মানুষের দেখা পেলাম। তাদের সাথে সংঘাতও হলো। একি! সবার সাথে সংঘর্ষ হয় কেন? মনে মনে আমি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়লাম। তাহলে কি এ পথ ভুল পথ? আমি কি ভুল পথে চলেছি? কখনো মনে হয়েছে, আমিই ঠিক, এই প্রকৃত পথ। মানুষ যদি নিজেকে ভালোবাসতে পারে তবে সবচেয়ে সুন্দর হবে। নিজেকে ভালোবাসতে গেলে সে তার পরিবারকে ভালোবাসবে। আর পরিবারকে ভালোবাসা মানেই একটি গ্রামকে ভালোবাসা। একটি গোষ্ঠীর মানুষকে ভালোবাসবে। আর একটি গ্রাম মানেই তো সারা পৃথিবী। পৃথিবীর সব মানুষ সব মানুষ সুন্দর হয়ে বাঁচবে। পৃথিবীতে কত বড় বড় কাজ করেছে মানুষ। একটা ছো্‌ট্ট পরিবারকে সুন্দর করা যাবে না? অবশ্যই যাবে। একটু যৌক্তিক হলে, একটু খোলামেলা হলে কত সমস্যা এমনিতেই মিটে যাবে। সম্পর্ক সহজ হলে কাজ সহজ হয়। আমরা চাইলেই তা করতে পারি। জানিনা এ চিঠিখানায় আপনি ভুল বুঝবেন কিনা। ঈদের আগে আগে বাড়ি আসবো। আম্মাকে বলবেন, যেন বড় মামার কাছ থেকে হাজার চারেক টাকা নিয়ে আমাকে পাঠায়। বাসায় রান্নার কিছুই কেনা হয়নি। বাইরের খাওয়ায় খরচ বেশী এবং অস্বাস্থ্যকর। আম্মার তদারকিতে দেওয়া সম্পত্তির এটুকুই তো রিটার্ন মাত্র। আপনার সেন্টিমেন্টে লাগতে পারে। লাগাটাই স্বাভাবিক। কারণ আপনার শ্বশুড়বাড়ি। আমাদের কিসের সেন্টিমেন্ট? শিমু মংলায় পড়বে, বাবু স্কুলে। আপনারা না চাইলেও এসব করা হবে। দোয়া করবেন।
শহীদুল্লাহ
তসলিমার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্যামা তরুণী শিমুলের সঙ্গে রুদ্রর প্রেম হয়েছিলো। কিন্তু শিমুলের অভিভাবক রাজী না হওয়ায় সে সম্পর্কও চুকে যায়। সেই থেকে রুদ্র আরো বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে যান। ভেতরে ভেতরে একা হয়ে যেতে থাকেন। কবির ভাষায়,

এতোটা নিঃশব্দে জেগে থাকা যায় না, তবু জেগে আছি
আরো কতো শব্দহীন হাঁটবে তুমি, আরো কতো নিভৃত চরণে
আমি কি কিছুই শুনবো না- আমি কি কিছুই জানবো না!

অতিরিক্ত অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতার ফলাফল যা হয়, শেষমেষ আলসারে পেয়ে বসেছিল রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে। পায়ের আঙ্গুলে রোগ বাসা বেঁধেছিল। ডাক্তার বলেছিলো পা বাঁচাতে হলে সিগারেট ছাড়তে হবে। তিনি পা ছেড়ে দিয়ে সিগারেট নিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যার ফলে রুদ্রর নতুন ঠিকানা হলো হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ২৩১ নম্বর কেবিন। ১৯৯১ সালের ২০ জুন ভালো হয়ে পশ্চিম রাজাবাজারের বাড়িতে ফিরে যান রুদ্র। কিন্তু ২১ জুন ভোরে দাঁত ব্রাশ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে মৃত্যুর কাছে পঁয়ত্রিশ বছরের স্বেচ্ছাচারী জীবনের সমর্পণ করে আঁধারপুরের বাসিন্দা হন বাংলা সাহিত্যের এ নক্ষত্র।
                                     সমাপ্ত
তথ্য সুত্রঃ https://goo.gl/RG1Xaq , https://goo.gl/NW3vms , https://goo.gl/VMAfBK , https://goo.gl/qBQahf

Saturday, November 25, 2017

আহমদ ছফা (জুন ৩০,১৯৪৩ - জুলাই ২৮, ২০০১), বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ ।

“একটা মানুষের মধ্যেই গোঁজামিল থাকে। কিন্তু যে সাপ সে হান্ড্রেড পারসেন্ট সাপ। যে শেয়াল সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শেয়াল। মানুষ সাপও হইতে পারে, শেয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেয়ার ক্ষমতা আছে। বুঝছো, গ্রাম দেশে আগে সাপ আর শেয়াল পাওয়া যাইতো। এগুলা নাই এখন। কারণ সাপ, শেয়াল এরা মানুষ হিসাবে জন্মাইতে আরম্ভ করছে

আহমদ ছফা ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী একজন সৃষ্টিশীল লেখক ষাটের দশকে তাঁর সাহিত্য-জীবনের সূচনা হয় সৃষ্টিধর্মী লেখক হিসেবে তিনি গল্পউপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা, অনুবাদ,  শিশুসাহিত্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব দেখান তিনি বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য-সাময়িকপত্র সম্পাদনা করেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে তিনি এক সফল লেখক জীবনের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে তিনি গল্প-উপন্যাস রচনায় কাজে লাগিয়েছেন তাঁর আখ্যানমূলক রচনায় বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা, মুক্তিকামনা স্বাধীনতাস্পৃহা এবং সামাজিক অসঙ্গতি বৈষম্যের চিত্র রূপায়িত হয়েছেআহমদ ছফার প্রবন্ধ পাঠ করলে পাঠক মাত্রই আবেশঘন অনুভূতির তীব্র প্রশ্নে জেগে উঠেনহৃদয়মন আত্মোপলব্ধির নব  চেতনায় মগ্ন হয়ে পড়ে মধুর আলেখ্যেস্বল্প পরিসরে বিশাল বিষয়কে পরিপূর্ণ অনুধাবনময়তায় প্রকাশ করার ক্ষমতা বিবেচনায় আহমদ ছফা শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যেরও একজন শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিকশুধু প্রবন্ধ কেন, উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প রম্য রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্তযদ্যপি আমার গুরু, ওঙ্কার, সূর্য তুমি সাথী প্রভৃতি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে নতুনমাত্রা সৃষ্টি করেছেবাংলা সাহিত্যে কয়েকজন শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিকের নাম বললেও নিরপেক্ষ বিচারে আহমদ ছফার নাম এসে যায়তবে দশটি প্রবন্ধের নাম বললে দুটির মালিকানা এসে যায় আহমদ ছফার কাছে- একটিবাঙালি মুসলমানের মন এবং অন্যটি - বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাসতার প্রবন্ধ যেন ষড়ঋতুর সোহাগ, সোনালী সূচনার অবগাহনে ক্রমান্বয়ে আকর্ষণীয় সঞ্চরণের বিহবল পরিক্রমায়  তৃপ্তিময় সমাপ্তি পরিচ্ছেদে বর্ণিত প্রবন্ধদ্বয় কেউ ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারলে তার কাছে বাঙালি, বাঙালি মুসলমান আর বাঙলার সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে তেমন কিছু অজানা থাকার কথা নয়স্বল্প পরিসরের তিনি বাঙালি মুসলমানের মন আর বুদ্ধিজীবীগণের মানসিকতাকে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বিদ্যমান পরিপূরকে যে নিপূণতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন তা সত্যি বিস্ময়করআহমদ ছফা ছাড়া অন্য কারও পক্ষে তা সহস্রাধিক পৃষ্ঠার গ্রন্থেও প্রকাশ করা সম্ভব হতো না একজন মানুষের একই সময়ে ত্রিকালদর্শী হওয়ার জন্য যে সব উপাদান আবশ্যক, সবকটি আহমদ ছফার ছিলত্রিকালদর্শীর প্রবন্ধ ত্রিকালেরই ছায়াতাই র্তার প্রবন্ধ কালজয়ী বাণী এবং বিদগ্ধ অনুসন্ধানের প্রশ্নময় কথকতা হয়ে ওঠেবাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে এখনও আহমদ ছফাকে টেক্কা দেওয়ার মতো তেমন কেউ নেইতাঁর প্রবন্ধগুলো বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা, প্রবন্ধজগতের আকড়মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে এমন কানো বিষয় নেই যা তাঁর প্রবন্ধের ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেনিবর্তমান প্রজন্মকে বাংলাদেশ, বাঙালি এবং বাঙালি সমাজ আর্থ-রাজনীতিক এবং সামাজিক বিবর্তন সম্পর্কে সত্যিকার অনুবোধে সৃজনশীল হয়ে উঠার অনুকূলে আহমদ ছফার গ্রন্থসমূহ পাঠের বিকল্প আছে বলে মনে হয় না

সূর্য তুমি সাথী (১৯৬৭), উদ্ধার (১৯৭৫), একজন আলী কেনানের উত্থান পতন (১৯৮৯), অলাতচক্র (১৯৯০), ওঙ্কার (১৯৯৩), গাভীবৃত্তান্ত (১৯৯৪), অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী (১৯৯৬), পুষ্পবৃক্ষ বিহঙ্গপুরাণ (১৯৯৬) আহমদ ছফার উপন্যাস এবং নিহত নক্ষত্র (১৯৬৯) তাঁর গল্পগ্রন্থকবিতায়ও আহমদ ছফার স্বতন্ত্রতা রয়েছেজল্লাদ সময়, একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা, লেনিন ঘুমোবে এবার ইত্যাদি একাধিক কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা তিনিঅনুভূতির প্রত্যক্ষ প্রকাশ, লোকজ ভাষা, পুথিপুরাণের শব্দ বাকরীতির প্রকাশ তাঁর কবিতার ধরণ হয়ে উঠেছেজার্মান কবি গ্যেটের বিখ্যাত কাব্য ফাউস্ট-এর অনুবাদ এবং বার্ট্রান্ড রাসেলের সংশয়ী রচনার বাংলা রূপান্তর আহমদ ছফাকে অনুবাদক হিসেবেও খ্যাতি এনে দিয়েছেঅবশ্য গবেষক প্রাবন্ধিক হিসেবেই তাঁর পরিচিতি সর্বাধিকআহমদ ছফার গবেষণার বিষয় ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজ সমাজের গঠন, বিকাশ, জাগরণ প্রতিষ্ঠা এবং বুদ্ধিবৃত্তির পরিচর্যা নিয়ে অন্যান্য চিন্তাবিদের মতো ছফাও গভীরভারে ভেবেছিলেনষাটের দশক থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে জাতির আত্মপরিচয়ের সন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেনছফার চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য রচনা বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৭৩) বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৭৬)-
উপন্যাস রচনায় আহমদ ছফার ক্ষান্তি চলে কয়েকবছর১৯৯৫ প্রকাশিত হয় গাভী বিত্তান্তবিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যঙ্গ করে এমন উপন্যাস বাংলা ভাষায় পূর্বে আর রচিত হয়নি তা নির্দ্বিধচিত্তে বলা যায়১৯৯৬- প্রকাশিত অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরীও বাংলা ভাষায় রচিত একটি অতুল্য উপন্যাস; কেননা আত্মজৈবনিক প্রেম অন্যান্য প্রসঙ্গে নিয়ে রচিত এমন জীবন্ত উপন্যাসের আর উদাহরণ কই! উপন্যাসে ছফা বেশী ভিন্নতার দাবিদার কারণে যে তাঁর সেই প্রেমিকাসহ অন্যান্য মানুষেরাও আমাদের সমাজের চেনা মুখ, প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব১৯৯৬ সালেই প্রকাশ পায় আহমদ ছফার আর একটি উপন্যাস যেটি অনন্যতার প্রশ্নে কম যায় নাতাহলো পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ 
আহমদ ছফার চয়ন কৌশল তুলনাহীন যেখানে যতটুক প্রয়োজন ঠিক ততটুক রস, ততটুক তথ্য, ততটুক যুক্তি এবং ততটুক বর্ণনা কোথাও বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জন নেই যা কোনরূপ প্রয়াস ব্যতিরেকে প্রকৃতির মতো নিবিড় অবহেলার শ্যামল আলেখ্যে ব্যাপ্ত তার লেখা প্রকৃতিময় সহজাত প্রবৃত্তিতে পাঠককে নিবিড় আগ্রহে টেনে রাখে রান্না পরিবেশনার কারণে অনেক ভালো খাদ্যও অখাদ্য হয়ে উঠে আবার রন্ধন পরিবেশনার গুণে সাধারণ মানের খাবারও  হয়ে উঠে অসাধারণ পরিবেশনার অপূর্ব কৌশলের কারণে যে কোনো সাধারণ বিষয়ও আহমদ ছফার প্রবন্ধে অসাধারণ হয়ে উঠত জ্ঞান, গরিমা, বুদ্ধি, সাহস, বিচক্ষণ পরিবেশনা, ছন্দময় আবহ-অনুরাগ, তীক্ষ্ম-সময়বোধ, প্রগাঢ় ঐতিহাসিকতা, নিষ্ঠাময় বাস্তবতার কোড়ক এবং সৃজনশীল তুলিকাব্যের নির্ভয় পদচারণা আহমদ ছফার প্রবন্ধগুলোকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধের সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে
ছফার লেখালেখিতে, তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বর্তমানময়তা আছে, আছে ইতিহাসের পরিচ্ছন্নতা তৃতীয় উপাদান গণমানুষের প্রতি অঙ্গীকার, এবং তা রাজনৈতিক অর্থে ছফার আরও ছিল সাহস তাঁর ক্ষেত্রে সাহস এসেছে ইতিহাসবোধ থেকে, অঙ্গীকার থেকে ছফার উত্তরসূরি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নিয়োজিত তরুণের সংখ্যা রীতিমতো উল্লেখযোগ্য তাঁদের অনেকেই সাহসের সমাচার পেয়েছেন, অনুমান করি, ছফার কাছ থেকে তাঁরা লড়ছেন বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে প্রভাবশালী বয়ান আর ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধও করছেন কিন্তু তাঁদের অনেক প্রশ্ন, তাঁদের অনুসন্ধান যথেষ্ট গভীরতা বা বিস্তৃতি পাচ্ছে না বলেই মনে হয় সম্ভবত অঙ্গীকারের অভাব আছে, আরও গোড়ায় আছে পরিচ্ছন্ন ইতিহাসবোধের অভাব
                                    সমাপ্ত

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

কবিতা

ইচ্ছে গুলো সাদা মেঘ, বৃষ্টি গুলো শুধুই বাঁচবার তাড়না। এখানে প্রেম নেই। এখানে ঈশ্বর পদানত মৃত্যুর কাছে। এখানে ঈশ্বর পদানত গাঁজার তুমুল ন...